:

চলে গেলেন বর্ষিয়ান রাজনীতিক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন

top-news

চলে গেলেন বর্ষিয়ান রাজনীতিক, সাবেক মন্ত্রী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। বয়স হয়েছিল তার ৮৩ বছর।

রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে বুধবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে তার মৃত্যু হয়

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর ওই বছরের ২৭ অক্টোবর রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকা থেকে মোশাররফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

২০২৫ সালের অগাস্ট রাতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে কারাগারের হাসপাতাল থেকে তাকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে ২০২৫ সালের ১৪ অগাস্টে জামিনে মুক্তি পান তিনি।

১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে মোশাররফ হোসেনের জন্ম। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিক এবং স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে তিনি লাহোরের ইঞ্জিনিয়ারিং কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি নেন। রাজনীতে যোগ দেয়ার পর তার নামের সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার শব্দটি যুক্ত হয়ে যায়।

হোরে অধ্যয়নকালে তিনি ছয় দফা আন্দোলনের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন সময় মিছিল সমাবেশে সরাসরি নেতৃত্ব দেন। এসময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে ছয় দফার যৌক্তিকতা তুলে ধরে লাহোরে পূর্ব পাকিস্তানে অধ্যয়নরত ছাত্রদের সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের এক সমাবেশে তিনি সভাপতিত্ব করেন। লাহোর থেকে দেশে ফিরে মানুষের কল্যাণ করার মহান ব্রত নিয়ে চট্টল শার্দুল এম.. আজিজের হাত ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে অতপ্রোতভাবে জড়িত হন।

১৯৭০ সালে তিনি সর্বপ্রথম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর তিনি ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮,২০১৪ এবং ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রিঃ তারিখে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালে তিনি সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদে তিনি বিরোধী দলীয় হুইপের এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে বেসামরিক বিমান পরিবহন পর্যটন এবং গৃহায়ণ গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি জাতীয় সংসদে বেসামরিক বিমান পরিবহন পর্যটন মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতিতে আসার পর তিনি দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বাকশাল এবং৭৭ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৮০ ৮৪ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৯২, ১৯৯৬, ২০০৪ এবং ২০১২ সালে সভাপতি এবং একই সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

একজন সৎ, ভদ্র, নম্র, স্পষ্টবাদী উদার মনোভাবের মানুষ হিসেবে নিজ দলের নেতাকর্মীসহ চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের নিকট তার সুনাম রয়েছে।

৭৫ পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের মন্ত্রী পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আহ্বান তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজ দলের আদর্শে অবিচল থেকেছেন সব সময়।

রাজনীতি করতে এসে মুক্তিযুদ্ধসহ বহুবার তিনি জীবন মৃত্যুর মুখোমুখী হয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

১৯৮০ সালে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট চত্বরে তৎকালীন  সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। সেসময় অনেক  আওয়ামীলীগ  নেতৃবৃন্দ আক্রান্ত হন। এসময় সন্ত্রাসীরা তার পায়ের রগ কেটে দেয়। ৮৮ সালে ২৪শে জানুয়ারী শেখ হাসিনার মিছিলে পুলিশ কর্তৃক গুলি চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যা করার ঘটনায় তিনিও মারাত্মকভাবে আহত হন।

৯২ সালের মে ফটিকছড়িতে জামায়াত ক্যাডারদের সশস্ত্র হামলায় গুরুতর আহত হয়ে অলৈাকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। ২০১৫ সালে তিনি গৃহায়ণ গণপূর্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেন।[

মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সেক্টর - এর সাব - সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। পাক-হানাদারদের বাঙালি নিধন এর নীলছক এর কালোরাত্রির তান্ডবটি শুধুমাত্র ঢাকা অন্য জেলাগুলোতে নয়, দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামেও হওয়ার কথা ছিলো। তারই প্রক্রিয়ায় বাঙালী জাতীয়তাবাদে উদ্ধুদ্ব ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিলো।

চট্টগ্রামে বাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য ছিলো যথাক্রমে প্রায় হাজার শত। বাঙালী সৈন্যদের মধ্যে ছিলো ইস্ট বেঙ্গল সেন্টারে নব-গঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল এর নতুন প্রায় ২৫০০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা। ছিলো ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এর উইং সেক্টর হেড কোয়ার্টার এর রাইফেলসরা এবং পুলিশ বাহিনী। পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা ছিল মূলত ২০-বালুচ এর। ২৫ শে মার্চ এর বিধ্বংসী কালোরাত চট্টগ্রামে পুনরাবৃত্তি করার জন্য চট্টগ্রামের সিনিয়র অবাঙালী অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফতেমিকে আদেশ দেয়া হয়, কুমিল্লা থেকে অতিরিক্ত সৈন্য পৌঁছানোর মধ্যে যেনো সমস্ত পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে ধরে রাখেন।

চট্টগ্রামে কালোরাত্রির নৃশংসতা ঠেকাতে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে সাহসী বীর বাঙালী যোদ্ধারা শুভপুর ব্রীজ উড়িয়ে দিয়ে কুমিল্লা থেকে আগমনকারী সেনাদলের পথ বন্ধ করে দেন এবং চট্টগ্রাম শহর ক্যান্টনমেন্টের প্রধান প্রধান এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলেন।

পরবর্তীতে তিনি সি.ইন.সি স্পেশাল ট্রেনিং নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করেন।

তাঁর পিতা এস.রহমান ১৯৬০ সালের দিকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নামকরা ব্যবসায়ী ছিলেন। এস. রহমান ১৯৪৪ সালে কলকাতায় তাঁর ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি চট্টগ্রামে চলে আসেন। চট্টগ্রামে তিনি ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স কর্পোরেশন নামক একটি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন যার মাধ্যমে তিনি অনেক রাস্তা, ভবন বাংলাদেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গড়ে তুলেন।

এস.রহমান সর্বপ্রথম কক্সবাজারে হোটেল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হোটেল সায়মন মোশাররফ হোসেনের পিতামহ ফজলুর রহমান দীর্ঘ ২০ বৎসর চট্টগ্রামের মীরসরাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক,স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনে প্রথম কাতারে থেকে জীবন বাজি রেখে নেতৃত্ব দিয়েছেন বর্ণাঢ্য রাজনীতিক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

চট্টগ্রামে সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের বিরুদ্ধে নিজ দলের সরকারের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলনে নেমে চট্টগ্রামের মানুষের কাছে নন্দিত হয়ে ছিলেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *